
নিজস্ব প্রতিবেদক : কুমিল্লা নগরের প্রায় দেড় শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা বর্তমান নগর ভবন প্রাঙ্গণেই ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক নগর ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং সিটি প্রশাসনের মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে এই বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংসদ সদস্যের আপত্তির মুখে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকল্পের দরপত্র (টেন্ডার) কার্যক্রম স্থগিত করায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে কুমিল্লা নগরবাসীর মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে একনেক সভায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য এই শতকোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পায়। দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি এই প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হলে দৃশ্যপটে আসে নতুন জটিলতা।
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী এই টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং স্থান নির্বাচন নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বর্তমান স্থান থেকে সরিয়ে ভবনটিকে নগরের দক্ষিণাঞ্চলের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন ছোট ধর্মপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়ার দাবি তুলেছেন। তার দাবি, নগরের আয়তন বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নতুন সীমানার সুবিধাজনক স্থানে ভবন হওয়া উচিত। পাশাপাশি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাকে না জানিয়ে টেন্ডার ডাকায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অপরদিকে, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু) এবং সাধারণ নগরবাসী বর্তমান ঐতিহাসিক স্থানেই ভবন নির্মাণের পক্ষে অনড়। ১৮৬৪ সালে যেখানে কুমিল্লা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই ঐতিহ্যবাহী স্থানটিই নাগরিক সেবা ও যোগাযোগের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে তারা মনে করেন।
এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে এবং টেন্ডার বাতিলের আবেদনের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ গত ৪ জুন একটি নির্দেশনা জারি করে। সরকারের উপসচিব মো. রবিউল ইসলামের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন ভবন নির্মাণের সব ধরনের টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি তদন্ত কমিটি গতকাল ৯ জুন (মঙ্গলবার) কুমিল্লা নগর ভবনের অতীন্দ্র মোহন রায় সম্মেলনকক্ষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বসে। উক্ত সভায় উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক, ব্যবসায়ী, এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বর্তমান স্থানেই নগর ভবন রাখার জোরালো দাবি জানান। তাদের মতে, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে যদি এই ১২৫ কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায় বা অন্য কোথাও চলে যায়, তবে তা হবে নগরবাসীর জন্য একটি বড় ধাক্কা।
বর্তমানে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ পুরোপুরি ঝুলে আছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। কুসিকের সাধারণ নাগরিকরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের অবসান না হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে শেষ পর্যন্ত কুমিল্লাবাসী এই বড় উন্নয়ন বাজেটটি হারাতে পারে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমান স্থানে তো একটি ভবন আছেই; সেখানে আরেকটি এখনই করতে হবে কেন? বর্তমান ভবনে তো কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না, কিন্তু নগরে অনেক জরুরি সমস্যা আছে, যেগুলো আগে ভবন নির্মাণের আগে সমাধান করা দরকার। এ ছাড়া বর্তমান প্রশাসক নির্বাচিত নন, তিনি নিয়মিত দায়িত্ব সামলাবেন। আগামী তিন মাস পর নির্বাচন। নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা ঠিক করবেন নতুন নগর ভবন কোথায় হবে। বর্তমান নগর ভবনটিও শহরের উত্তর কোণায় অবস্থিত; মানুষ সেখানে যেতে চরম দুর্ভোগে পড়ে।
Leave a Reply