
মানুষের জীবন জন্ম থেকে মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক সীমিত সময়। এই সময়টুকুতে আমরা সবাই জীবনের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত—শৈশবে বড় হওয়ার স্বপ্ন, ছাত্রজীবনে ভালো ফল, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা, সংসার গড়া, বাড়ি-গাড়ি কিংবা সন্তানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। একেকটি অর্জন যেন জীবনের সমীকরণে নতুন একটি যোগফল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব অর্জন কি সত্যিই আমাদের সুখী করে?
অর্থনীতির ‘ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধি’ দিয়ে জীবনের এই প্রশ্নের একটি সুন্দর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কোনো দ্রব্য বা সেবার অতিরিক্ত এক একক ভোগে যে বাড়তি তৃপ্তি মেলে, অর্থনীতিতে তাকে বলে প্রান্তিক উপযোগ। জীবনের ক্ষেত্রেও প্রতিটি নতুন অর্জন আমাদের আনন্দ দেয়—তবে সেই আনন্দ সব সময় সমান থাকে না।
ছাত্রজীবনে ভালো ফল, প্রথম চাকরি কিংবা ব্যবসায় প্রথম সাফল্য—এসব অর্জনের আনন্দ অনেক গভীর। কারণ, তখন প্রতিটি নতুন ধাপই আমাদের কাছে স্বপ্নপূরণের মতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন জীবন গুছিয়ে আসে, সামাজিক মর্যাদা বাড়ে, আর্থিক স্বচ্ছলতা তৈরি হয়, তখন আগের মতো একই আনন্দ আর জাগে না। আরও কিছু পাওয়ার ইচ্ছা থেকে যায়, কিন্তু সেই প্রাপ্তি আমাদের মনে আগের মতো তৃপ্তি এনে দিতে পারে না।
এখানেই শুরু হয় সফলতার দৌড়। এক অর্জনের পর আরেক অর্জনের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা কখনো থেমে নিজেদের জিজ্ঞেস করি না—কেন ছুটছি, আর কোথায় গিয়ে থামব? অর্থ ও মর্যাদা বাড়তে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে সুখও যে একই হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং কোনো একসময় অতিরিক্ত অর্জন ক্লান্তি, অস্থিরতা কিংবা শূন্যতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জীবনের হিসাব অবশ্য শুধু অর্থ, পেশা কিংবা সামাজিক পরিচয়ে শেষ হয় না। পরিবার, সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ এবং আত্মিক তৃপ্তিও এই হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে সন্তানকে ভালোবাসা, সময় ও নৈতিক শিক্ষা দিয়ে মানুষ করে তোলার দায়িত্বের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একটি সন্তান যখন মানবিক, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠে, তখন তার সুফল শুধু পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; সমাজও উপকৃত হয়। অর্থনীতির ভাষায়, এ যেন সমাজের জন্য ইতিবাচক এক ‘এক্সটার্নালিটি’।
সন্তানকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই যে জীবনের একমাত্র সাফল্য—তা নয়। তবে এই দায়িত্ব পালনে ভালোবাসা ও যত্নের ঘাটতি থাকলে, জীবনের অন্য অর্জনগুলোও অনেক সময় অসম্পূর্ণ মনে হয়। কারণ, ব্যাংক হিসাবের অঙ্ক বাড়লেও প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ, সন্তানের মুখের হাসি কিংবা নিজের কাজের প্রতি তৃপ্তি—এসবের বিকল্প কোনো সম্পদ নেই।
জীবন তাই কেবল সংখ্যা, গ্রাফ কিংবা সাফল্যের তালিকা নয়। সফলতা অর্জনের পাশাপাশি সেই সফলতার আনন্দ উপভোগ করতে শেখাও জরুরি। আমাদের লক্ষ্য হোক—শুধু আরও বেশি পাওয়া নয়, যা পেয়েছি তার মধ্যে অর্থ খুঁজে পাওয়া; পরিবারকে সময় দেওয়া, দায়িত্ব পালন করা এবং মনে শান্তি রাখা। জীবনের শেষ প্রান্তে যেন অর্জনের হিসাব বড় হয়, আর সুখের খাতাটিও শূন্য না থাকে—সেই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।
মো. নাছির উদ্দিন পাটোয়ারী
বি.এস.এস. (অনার্স), এম.এস.এস. (অর্থনীতি), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যাংকার, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক
সভাপতি, অফিসার্স ফোরাম, বরুড়া
সভাপতি, নরিন্দ্রপুর-নোয়াদ্দা উচ্চ বিদ্যালয়
Leave a Reply