
সুজন মজুমদার, বরুড়া :
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, চিকিৎসাসেবায় অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালের ভেতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার কক্ষে একটি মোটরসাইকেল রাখা অবস্থায় দেখা যায়। বাইকের সাথে একই কক্ষে প্রাণীদের চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হচ্ছে।
এ সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান তনুকে অফিসে পাওয়া যায়নি। জানা যায়, তিনি জেলা শহরে অবস্থান করছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে তিনি অধিকাংশ সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকেন না। সরকারি আদেশে (জিও) বিদেশে পিএইচডি করতে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অফিস কার্যক্রমে সময় দিতে পারছেন না। এমনকি তিনি কখন অফিসে আসেন বা যান, সে বিষয়েও উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে কোনো ভেটেরিনারি সার্জন বা চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে দেখা যায় উপজেলা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নুরুজ্জামানকে। তিনি বলেন, “আমার ৩৩ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে এখানে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি। নিয়ম অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন লেখার কথা নয়, তারপরও বাস্তবতার কারণে করছি।
ভুল চিকিৎসার অভিযোগ শাকপুর গ্রামের ফারভেজ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “আমার একটি গাভী গর্ভধারণ করেছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। তিনি নিজেকে সরকারি ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, গাভীটি গর্ভধারণ করেনি। এরপর বিভিন্ন ওষুধ ও ইনজেকশন দেন। কিন্তু প্রায় এক মাস পর গাভীটি একটি মৃত বাছুর প্রসব করে।” তিনি আরও বলেন, “ভুল চিকিৎসার কারণেই বাছুরটি মারা গেছে বলে আমি মনে করি। এতে গাভীটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। শুধু ‘দেখছি, দেখবো’ বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে।”
ফারভেজ হোসেনের অভিযোগ, সরকারি ডাক্তার পরিচয় দেওয়া সাইফুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। তিনি বলেন, “সরকারি ভ্যাকসিন কীভাবে তিনি ব্যবহার করেন, সেটিই বড় প্রশ্ন। প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকজনকেও তার সঙ্গে চিকিৎসা কার্যক্রমে দেখা যায়।
পয়ালগাছা ইউনিয়নের হাটপুকুরিয়া গ্রামের স্মাইল হোসেন বলেন, আমার একটি ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়লে উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি ডাক্তার নেই। পরদিন আসতে বলা হয়। পরেরদিন গেলে ডাক্তার জানান, ছাগলটির অপারেশন করতে হবে। অপারেশনের সময় দুই জায়গায় কাটা হলেও মূল সমস্যার সমাধান করা হয়নি। পরে সেলাই করে আমাকে বলা হয় ছাগলটি বাড়িতে নিয়ে জবাই করে ফেলতে। চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে গিয়েছিলাম, কিন্তু সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছাগলটিও জবাই করতে হলো।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান তনু বলেন, “গাড়ি অফিসে থাকবে, এটি স্বাভাবিক। আমার গাড়ি গ্যারেজে রাখা আছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত অফিস করেন। কারও ব্যক্তিগত কাজ থাকতে পারে। কেউ বাজারে গেছে, কেউ লাঞ্চে গেছে।”
উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রেসক্রিপশন লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, “তিনি অবশ্যই লিখতে পারেন। হয়তো ভয় পেয়ে বলেছেন যে তিনি লিখতে পারেন না।”
গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে নিয়মিত অফিস না করার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমার জিওর বিষয়ে তদারকি করতে হয়েছে। না হলে ফাইল পড়ে থাকত। আমি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে জানিয়েই গেছি। ডিজি অফিসে যাওয়ার বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।”
উল্লেখ্য, ডা. নুসরাত জাহান তনু ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর বরুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সামছুল আলম বলেন, “বরুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা তনু আমার কাছে তিন থেকে চারবার মৌখিকভাবে ছুটির অনুমতি চেয়েছেন।” হাসপাতালের কক্ষে মোটরসাইকেল রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, “রুমের ভেতরে বাইক রাখা অবশ্যই সমীচীন নয়। এতে অফিসের সৌন্দর্য ব্যাহত হয়।”
প্রেসক্রিপশন লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, “ওষুধের প্রেসক্রিপশন লেখার ক্ষমতা সরকার কেবল ভেটেরিনারি সার্জনদের দিয়েছে। তবে সরকারি ভ্যাকসিন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রয়োগ করতে পারেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বরুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে প্রাণিসম্পদ খাতের সেবাপ্রত্যাশীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরকারি / আরা/২০২৬
Leave a Reply