
নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লা ইপিজেডে ফুটপাত সংস্কারে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বরাদ্দের দেড় কোটি টাকার বেশির ভাগ ভাগবাঁটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইপিজেডের ফুটপাত সংস্কার এবং ড্রেন মেরামতের জন্য ওই টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই প্রকৌশলী এবং ইডি ও নির্বাহী প্রকৌশলীর যোগসাজশে ওই লুটপাট করা হয়। ওই কাজের দরপত্র আহ্বানের পর ঠিকাদার কাজ না করায় নিরাপত্তা জামানত বাতিলসহ চুক্তি করায় নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে তৃতীয় পক্ষ দিয়ে কাজ করানো হয়। বিষয়টি নিয়ে কুমিল্লা ইপিজেডে নানা সমালোচনা এবং অস্থিরতা বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা ইপিজেডের বিদ্যমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১ নম্বর কাস্টমস গেট থেকে দুই নম্বর কাস্টমস গেট পর্যন্ত ফুটপাত ও ড্রেন সংস্কারের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্র অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল মো. কামাল উদ্দিন নামে একজন ঠিকাদার এই উন্নয়নকাজ পান। ইপিজেড কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে তাকে কাজের সাইট বুঝিয়ে দেয়। ইপিজেডের সহকারী প্রকৌশলী আল মাসুম এবং উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রাসেল খলিফা কাজটি তদারকি করেন।
ঠিকাদার সাইট বুঝে নিয়ে কাজ শুরু না করায় ইপিজেড কর্তৃপক্ষ তাকে পরপর পাঁচটি চিঠি দেয়। পাঁচটি চিঠি দেওয়ার পর ঠিকাদার কাজ শুরু না করায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কারণ দর্শানোর নোটিশের উত্তর না দেওয়ায় পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ও চুক্তিপত্র বাতিল করার জন্য নির্বাহী দপ্তরে নথি পাঠানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট পারফরম্যান্সসহ চুক্তিটি বাতিলের অনুমতি দেওয়া হয়।
নির্বাহী দপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রহমান যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নথিটি হিসাব শাখায় পাঠানোর নিয়ম থাকলেও সে ফাইলটি কুমিল্লা ইপিজেডের নির্বাহী প্রকৌশলী কবির হোসেনের কাছে পাঠিয়ে দেন। পরে কোনো প্রকার টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে কাজটি করার জন্য প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রহমান নির্দেশ দেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং নিয়মবহির্ভূত। এতে নামকাওয়াস্তে কাজ দেখিয়ে দেড় কোটি টাকার বেশির ভাগ টাকা লুটপাট করা হয়। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত বিল তুলে নেন।
সূত্র জানায়, প্রকল্প থেকে ঠিকাদার সরে দাঁড়ানো এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কাজ করানোর সব প্রক্রিয়ায় যুক্ত ইপিজেডের সহকারী প্রকৌশলী আল মাসুম। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় লোক দাবি করতেন। তার নিজস্ব ঠিকাদার দিয়ে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে, নকশায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাপ বা আইটেম রেখে এবং নিজেরাই বিলের আগে একটি কমিটি করে অনেক প্রকল্পের বিল তুলে নিয়েছেন। তার তদারকিতে অনেক কাজই শিডিউল মোতাবেক হয়নি। এতে গত ৫ বছর তার সুপারভিশন কাজগুলো তদন্তের দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রহমানের সিন্ডিকেটের লোক বলে জানা গেছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কুমিল্লা ইপিজেডের ১ নম্বর কাস্টমস গেট থেকে ২ নম্বর কাস্টমস গেট পর্যন্ত ফুটপাত মেরামত করা হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায় ফুটপাতের গ্রিলের পুরুত্ব ৬ মিলিমিটারের পরিবর্তে মাত্র দুই-আড়াই মিলিমিটারের গ্রিল লাগানো হয়। নিম্নমানের পেভিংস টাইলস ফুটপাতে লাগানো হয়েছে, যা এখনই ভেঙে যাচ্ছে।
কাজের বিল অব কোয়ান্টিটিজের মধ্যে গ্রিল, ইট, পলেস্তারা, রং, পেভমেন্ট টাইলসসহ ৩৪ প্রকার কাজের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে আট-দশটি কাজের নমুনা পাওয়া যায়। টেন্ডারে ড্রেন মেরামত উল্লেখ থাকলেও কোনো কাজ করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইপিজেডে কর্মরত নিরাপত্তাসহ একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আল মাসুম, সহকারী প্রকৌশলী (পুর) ইপিজেডের সংস্কার এবং উন্নয়নের কাজে নানা ধরনের অনিয়মে জড়িত রয়েছেন। এই প্রকৌশলী পাঁচ বছরের অধিক একই স্টেশনে কর্মরত রয়েছেন।
প্রকল্পের তদারক কর্মকর্তা সহকারী প্রকৌশলী আল মাসুম বলেন, টেন্ডার ছাড়া কাজটি হয়নি। প্রথম ঠিকাদার কাজে ব্যর্থ হওয়ায় উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি করা হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি এখানে কর্মরত অবস্থায় কোনো প্রকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। তাছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।
অপর তদারক কর্মকর্তা উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাসেল খলিফা বলেন, কাজটা কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে এটা সহকারী প্রকৌশলী আল মাসুম ভালো বলতে পারবেন। তিনি সবকিছুর তদারকি করেছেন। সব দায়-দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন।
কুমিল্লা ইপিজেডের সাবেক প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান বলেন, আমি এখন কুমিল্লা ইপিজেডে নেই। এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারব না।
সাবেক নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাহবুব বলেন, বিষয়টি প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্ব। সেখানে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি হয়ে থাকলে তার দায় তাদেরই নিতে হবে।
কুমিল্লা ইপিজেডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) কবির হোসেন বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র: দৈনিক যুগান্তর
Leave a Reply